আজকের দিন তারিখ ১৫ আগস্ট, ২০২০, শনিবার, ৩১ শ্রাবণ, ১৪২৭
সর্বশেষ সংবাদ
সম্পাদকীয় চলুন, ইচ্ছেমতোই বাঁচি!

চলুন, ইচ্ছেমতোই বাঁচি!


পোস্ট করেছেন: dinersheshey | প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৩১, ২০২০ , ২:০০ অপরাহ্ণ | বিভাগ: সম্পাদকীয়


শ্যামল দত্ত, সম্পাদক :  সেই যে কবে গুরুদেব লিখে গেছেন ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে, তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ করোনার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড অতিমারির এই যুগে বিপর্যস্ত যখন জীবন, জীবনের কঠোর বাস্তবতায় যখন তটস্থ দিনকাল, তখন এই ভয়ঙ্কর সময়ে মানুষের রসবোধেরও অভাব নেই। জীবনে কষ্ট আছে, দুঃখ আছে, বেদনা আছে কিন্তু জীবন তো থেমে নেই। জীবন তো চলছে জীবনের গতিতে। তাই তো পার্থ বড়ুয়া যখন গায় ‘তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে, জীবনের নিয়মে’- তখন মনে হয়, চারপাশে এত মৃত্যু, এত কষ্ট, তা সত্ত্বেও জীবনপ্রবাহ তো থেমে থাকে না। এটা সত্যি যে, মৃত্যু যে জীবনের কত কাছে অবস্থান করে- তা উপলব্ধি করার জন্য বোধহয় এরকম একটা ধাক্কার দরকার ছিল। কিন্তু এর মধ্যেও জীবন কি থেমে আছে?

প্রতিদিন সূর্য উঠে, ভোর হয়, আলো ছড়ায়। অন্ধকার দূর করে সময় ফুটে ওঠে নিজের মতো করে। ফুল ফোটে, পাখিরা কলরব করে। একটা সময় সূর্য আবার ডুবে, অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পৃথিবী ঝিমিয়ে পড়ে আবার জেগে ওঠার প্রত্যাশা নিয়ে এবং এটাই তো সত্য- পৃথিবী আবার নতুন করে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়। তাই করোনার এই অন্ধকার সময়ের মধ্যে আলোর প্রত্যাশায় আছে মানুষ। এই সময়ের মধ্যে যদিও আমরা বহু মানুষকে হারিয়েছি এই পৃথিবী থেকে। তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। কিন্তু এই মৃত্যু কি শিক্ষা দিয়েছে বিশ্ববাসীকে- তাই এই মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে গুরুগম্ভীর বিশ্লেষকরা আগামী সময়টাকে নাম দিচ্ছেন ‘নিউ নরমাল’- যেখানে নাকি পাল্টে যাবে বিশ্ব ব্যবস্থা। নতুন চেহারা নিয়ে আসবে পুরো পৃথিবী। কিন্তু হতাশাবাদীদের মতে, পৃথিবী আগের পুরনো চেহারাতেই ফিরবে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কোনোভাবেই এতকিছুর পরও মাস্ক পরানো যায়নি। কক্সবাজার বিচে লাল কাঁকড়াগুলোকে নিউ নরমালে আবার লুকিয়ে পড়তে হবে মাটির নিচে। কারণ মানুষের বেসামাল পদচারণায় তাদের বিচরণের জায়গা আবারো সংকুচিত হবে। গাড়ির ধোঁয়ায় বাতাসে আবার কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাবে। ছোট্ট শিশুদের হৃৎপিণ্ড ভর্তি হয়ে যাবে বিষাক্ত বাতাসে। ঢাকা আবার পরিণত হবে গ্যাস চেম্বারে। সুতরাং ‘আমি এখনো আশাবাদী’ এ কথা বলে নতুন পৃথিবীর অপেক্ষায় থাকা মানুষজনের আশাহত হওয়ার ঘটনা ঘটবে। কারণ এই দুর্যোগের মধ্যে পৃথিবীর ১২ জন শ্রেষ্ঠ ধনীর সম্পদ দ্বিগুণ হয়েছে, মৃত্যু কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে দেখেও ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট বানানোর ব্যবসা থামেনি, চিকিৎসায় দুনম্বরি বন্ধ হয়নি, পয়সা কামানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহারও করেছে করোনা চিকিৎসাকে। তাই এই দুঃসময়েও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অনেকে ছিদ্র খুঁজে নিয়েছেন পয়সা কামানোর জন্য। যাদের কেরামতি জানা আছে, তারা নদীর ঢেউ গুনতে দিয়েও পয়সা কামিয়ে নেয়- এই গল্প তো আমরা সবাই জানি।

তবে করোনার এই দুঃখময় সময়ে মানুষের রস প্রতিভার যে বিস্তর বিস্তার ঘটছে, সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাদের নিয়মিত বিচরণ, তারা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। অলস সময়ে প্রতিভা বিকশিত হয় কিনা তা ভালো বলতে পারবেন মনস্তত্ত্ববিদরা, তবে লকডাউনে মানুষের চিন্তার যে উদ্ভাবনী চেহারা ফুটে উঠেছে, তা সত্যি বিস্ময়কর। এই লকডাউন শব্দটি নিয়েও হাস্যরস কম হয়নি। মানুষকে ঘরে রাখতে সরকার যখন শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ, তখন নানা পরামর্শ এসেছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। কেউ বলেছেন পুলিশ-সেনাবাহিনী দিয়েও যখন ঘরে ঢোকানো যাচ্ছে না তখন করোনা রোগীদের বাইরে ছেড়ে দিলেই মানুষ বাপ বাপ করে ঘরে ঢুকে যাবে। রাশিয়ায় করোনা রোগীদের বাইরে যাওয়া ঠেকানোর জন্য পুতিন রাস্তায় সিংহ ছেড়ে দিয়েছেন- এমন খবর ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। যদিও নিন্দুকরা বলছেন, রাশিয়াতে সিংহের স-ও নেই। বাঘ আছে গুনে গুনে চারশোর মতো। উত্তর কোরিয়া করোনা চিকিৎসার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। আক্রান্ত রোগীকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মেরে ফেললে রোগীও খতম, করোনাও খতম। কিন্তু গত ছয় মাসে করোনা মোকাবিলায় যেসব অভিনব পদ্ধতি দেখা গেছে, তাতে অতিরিক্ত সার প্রয়োগে বাংলাদেশের মাটির উর্বরতা কমে গেলেও কোনোরকম সার ছাড়াই মানুষের মাথা যে এখনো কী পরিমাণ উর্বর- তা প্রমাণ হয়ে গেছে। কে যেন বলেছে মাথার চুলে করোনা বাসা বাঁধে। তাই মুণ্ডিত-মস্তকে করোনা আক্রান্তের সম্ভাবনা কম- এমন খবরে উল্লসিত হয়ে বিভিন্ন শহরে মস্তক মুণ্ডনের হিড়িক পড়ে যায়। করোনার মহৌষধ হিসেবে গোমূত্র পানের ধুম পড়ে যায় বাবা রামদেবের প্রেসক্রিপশনে। শেষ পর্যন্ত তিনি অতিরিক্ত গোমূত্র পান করে অসুস্থ হয়ে নিজেই হাসপাতালে ভর্তি হলে গোমূত্র পানের এই উন্মাদনা কমে যায়। তবে তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কিনা বলতে পারব না, কুয়েতের মরুভূমিতে উটের মূত্র পান বন্ধ করতে কুয়েতের পুলিশ বাহিনীকে রীতিমতো আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। কবে কখন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই নিজের মূত্র নিজেই পান করে কী উপকার পেয়েছেন তার বৈজ্ঞানিক গবেষণাও সামাজিক মাধ্যমে কম পাওয়া যায়নি।

তবে করোনার এই দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে নারী-পুরুষ, স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনের মধ্যে। ঘরবন্দি জীবনে লকডাউন এবং লকআপের পার্থক্য নিয়ে নানারকম বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে। স্ত্রীর অধীনে থাকা লকডাউন জামিন অযোগ্য, অন্যদিকে পুলিশের অধীনে থাকা লকআপে জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখনো স্বামীরা যথেষ্ট গোল করে রুটি বানাতে পারছে না দেখে লকডাউন আরো বাড়ানোর আবেদন করেছে সম্মিলিত স্ত্রী পরিষদ- এমন খবরও পাওয়া গেছে। অফিসে কেতাদুরস্ত স্বামী বাসায় বাসন মাস্তে মাস্তে হাত ঝামা করে ফেললেও, স্বামী কোনো কাজ করছে না, সারাক্ষণ বাসায় বসে বিড়ি ফুঁকছে আর টেলিভিশন দেখছে এমন অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গেছে। এ বিষয়ে বিচারকের মন্তব্য, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বন্দিদের খাবার দেয়া বাধ্যতামূলক।

এক বিবাহিত পুরুষ আর্তনাদ করেছেন, বাইরে করোনা, ঘরে বউ, আমরা যাব কোথায়? আমাদের দিকটা একটু ভাবুন। আমরাও তো মানুষ। তবে এক স্বামী আকুল আবেদন জানিয়েছেন- বাইরে বেরোলে পুলিশ পেটাচ্ছে, এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেবেন না। কারণ এটা জেনে স্ত্রীরা স্বামীকে পুলিশের হাতে মার খাওয়ানোর জন্য বারবার বাজারে পাঠাচ্ছে। তবে এটাও হয়েছে ঘরে থাকতে থাকতে স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম হয়ে গেছে আর বান্ধবীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি, একেবারে তছনছ অবস্থা।

কিন্তু সবচেয়ে আশা জাগিয়েছে করোনা রোগীদের ভালোবাসা বিয়ে পর্যন্ত গড়ানোর খবর। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলা আইসোলেশন সেন্টারে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পুরুষ করোনা রোগী ও নারী করোনা রোগীর মধ্যে সৃষ্ট প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়েছে। বেরসিক গণমাধ্যম কর্মীর প্রশ্নের জবাবে এই নতুন বিবাহিত যুগল বলেছেন, করোনায় মৃত্যু অনিবার্য। তাই মরার আগে আমরা বিয়েটা সেরে ফেললাম। তবে আইসোলেশন সেন্টারে কীভাবে প্রেম হলো তা নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি করাটা সঠিক হয়নি বলে অনেকের মত। কারণ মৃত্যুশয্যায় দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত প্রেমের স্বীকৃতি পাওয়ার নজির আছে বাংলা সিনেমায়। সেখান থেকে যদি কেউ অনুপ্রাণিত হয়, তাহলে দোষ তো তাদের নয়। দোষ যে কার তা অবশ্য খুঁজে পাওয়া আরো কঠিন। একজন লেখক অবলীলায় বলেছেন দোষী খুঁজে পাওয়া বাংলাদেশে সবচেয়ে কঠিন বিষয়। তিনি স্বীকার করেছেন, এই প্রথম জানলাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দুজন আলাদা ব্যক্তি। একজন ভোটার খুঁজে পায় না আরেকজন করোনা রোগী খুঁজে পায় না। কিন্তু দুজনের চেহারা এবং কথার মধ্যে যে অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়- সেটা তো সত্যি।

দোষী খুঁজে পাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে দোকান মালিক সমিতি। তাদের প্রস্তাব ছিল- ঈদের সময় মার্কেটে মাস্ক ছাড়া প্রবেশ করলে ৫০০ টাকা আর দোকানে হাঁচি-কাশি দিলে ১ হাজার টাকা জরিমানা করবে। কিন্তু এই অপরাধের জন্য কোনো দোষী ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে কাউকে জরিমানা করাও সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি মাস্ক পরে বাইরে বেরোনো বাধ্যতামূলক করা হলেও লোকজনকে মাস্ক পরানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কুরবানির বাজার শুরু হয়েছে এবং গরুরা সবাই মাস্ক পরে বিক্রির জন্য তৈরি হলেও ক্রেতাদের অনেকের মুখে মাস্ক নেই। গরু না মানুষ- কার জন্য মাস্ক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে তা নিয়ে বিভ্রান্ত সবাই। তবে বাংলাদেশে এসে মহাপরাক্রমশালী করোনাভাইরাস পরাজিত হয়েছে এমন বিশ্বাস অনেকের। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে এই ভাইরাস যে তাণ্ডব চালিয়েছে তার ছিটেফোঁটা কৃতিত্বও করোনা বাংলাদেশে দেখাতে পারেনি। অনেকে এর জন্য চীনের দুনম্বরি ব্যবসায়িক নীতিকে দুষছেন। তাদের মন্তব্য এই চীনারা পশ্চিমা বাজারের জন্য উন্নতমানের জিনিস বানায়, অন্যদিকে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পাঠায় নিম্নমানের জিনিস। বাংলাদেশে পাঠানো করোনাভাইরাস এই নীতি অনুসরণ করে বানানো হয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ। এ ধারণার সমর্থনে অনেকের যুক্তি, তাদের নিজের দেশে তারা দুনম্বরি মাল বেচে। যে কারণে চীনে করোনাভাইরাস খুব বেশি পারফরম্যান্স দেখাতে পারেনি। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে ‘সিল্ক স্ট্রিট’ নামের একটি মার্কেট আছে যেখানে পৃথিবীর তাবৎ নামি-দামি ব্র্যান্ডের দুনম্বরি মাল পাওয়া যায় একেবারে সস্তায়। ওই মার্কেটের জন্য তৈরি করা দুনম্বরি করোনা বাংলাদেশে এসেছে বলে অনেকে মনে করছেন। অন্যথায় এর ভয়াবহতা বাংলাদেশে আরো বাড়ত। তবে এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে আফ্রিকার অখ্যাত এক দেশ বুরুন্ডি। বুরুন্ডিতে করোনা পাওয়া যায়নি। আফ্রিকার অনেক দেশে চীন করোনা রপ্তানি করলেও বুরুন্ডি কেন বাদ পড়ে গেল, বিবিসির এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে সে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, বিষয়টা আসলে তা নয়। আমাদের দেশে করোনা পরীক্ষার কিট নেই, তাই পরীক্ষাও নেই এবং আর করোনাও নেই। বুরুন্ডির এই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি আছে। ট্রাম্প বলেছেন, আমাদের দেশে পরীক্ষা বেশি, তাই করোনা রোগীও বেশি। ট্রাম্প করোনা রোগীর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নাম এক নম্বরে রাখতে নারাজ। চীনের দিকে আঙুল তুলে তিনি বলেছেন তারা কম পরীক্ষা করে। পরীক্ষা কম বলেই তালিকায় নিচের দিকে আছে। অন্যথায় তাদের নাম আমাদের উপরে থাকার কথা। বুরুন্ডির ব্যাপারে অবশ্য ট্রাম্পের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

লকডাউন জীবন
তবে এই লকডাউন যে কবে শেষ হবে তার কোনো ভবিষ্যদ্বাণী না পাওয়ায় অনেকেই হতাশ। সরকার বারবার অনুরোধ করছে, ঘরে থাকুন, বিনা প্রয়োজনে বের হবেন না। ঘরে থাকতে থাকতে ক্লান্ত এক গৃহস্বামী বললেন, না আর পারা যায় না। যাই, বাইরে গিয়ে পুলিশের একটা থাপ্পড় খেয়ে আসি। অন্যদিকে স্ত্রীর আক্ষেপ দুই হাজারের বেশি লিপস্টিক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ব্যবহারের সুযোগ পেলাম না। শাড়ি না পরতে পরতে মেয়েরা শাড়ি পরা ভুলে যাচ্ছে। পুরুষদের গোঁফ-দাড়ি গজাতে গজাতে বীভৎস রূপ ধারণ করেছে। পার্লারে যাওয়া বন্ধ। ফেসিয়ালের অভাবে তাই মুখে গজিয়ে যাওয়া লোমে স্বামী-স্ত্রী অনেক সময় একে অপরকে চিনতেও পারছেন না। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠছেন। এত কিছুর মধ্যেও পৃথিবী থেমে থাকে না। ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, তবুও জীবন যাচ্ছে কেটে জীবনের নিয়মে। গত চার মাসে ঘর থেকে একবারের জন্যও বের হননি, এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তারা হয়তো সংগীতশিল্পী মাহফুজুর রহমানের কথা শুনেছেন। শিল্পী মাহফুজুর রহমান বলেছেন, প্রয়োজনে আমার গান শুনুন, তবু ঘরে থাকুন। প্রয়াত শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের অভাব তিনি পূরণ করার অঙ্গীকার করেছেন এবং এই অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে আগামী কুরবানির ঈদে তিনি নতুন গান নিয়ে হাজির হবেন টেলিভিশনের পর্দায়। ঘরবন্দি মানুষের জন্য এটা সুসংবাদ না দুঃসংবাদ, তা অবশ্য গানের সমঝদাররা ভালো বলতে পারবেন। তবে এসব ক্ষেত্রে শিল্পী মাহফুজুর রহমানের সরল স্বীকারোক্তি একেবারে শিশুতোষ পর্যায়। এক সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে বলেছেন, আমি আমার গান শোনার জন্য কারো মাথায় পিস্তল ধরিনি। গান শোনা না শোনা প্রত্যেকের নিজের ইচ্ছা। আর আমার গান শুনে কেউ আত্মহত্যা করেছেন এমন কোনো প্রমাণ তো পাইনি। যদি প্রমাণ থাকে, সেই পরিবারের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করার অঙ্গীকারও তিনি করেছেন। রিমান্ডে থাকা আসামিদের শাস্তি হিসেবে মাহফুজুর রহমানের গান শোনানো হয় এমন খবরও পাওয়া গেছে। ইদানীংকালে রিমান্ডে থাকা আলোচিত আসামি সাহেদকে শাস্তি হিসেবে মাহফুজুর রহমানের গান শোনানো হচ্ছে আর সাহেদ গড়গড় করে অকপটে তার অপরাধ স্বীকার করে যাচ্ছে- এমন গুজবও ছড়িয়েছে কে বা কারা।

কিন্তু ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন বললে তো আর মানুষকে ঘরে রাখা যায় না। নানা উছিলায় ঘর থেকে বেরোনোর কায়দা বের করে নেয় অনেকে। তবে রাজধানীর রাজাবাজারবাসীকে লকডাউনে ঘরে রাখতে হিমশিম খেতে হয়েছে স্বেচ্ছাসেবকদের। ঘরে থাকার শর্ত হিসেবে অভিনবত্ব দেখিয়েছে রাজধানীর রাজাবাজারবাসীরা। রাজার বাজার বলেই কথা। মাঝরাতে এক রাজাবাজারবাসী স্বেচ্ছাসেবকদের ফোন করে বলেছেন, জর্দা নেই, ভাই পান খেতে পারছি না। তাই আমার পানের জন্য হাকিমপুরী জর্দা চাই। নাতি তো আবার গরম পিৎজা খাওয়ার বায়না ধরেছে। একটা গরম পিৎজা হলে ভালো হয়। একজন আবার আবদার করেছেন, একা একা ঘুম আসছে না। কয়েকটা পেগ আর গার্লফ্রেন্ড পাওয়া যাবে কি? এমন অদ্ভুত চাহিদায় বিরক্ত না হয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা গভীর ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। শেষ পর্যন্ত কি কি সেবা তারা দিয়েছেন তা অবশ্য জানা যায়নি, তবে গভীর মমতায় তারা রাজাবাজারের রাজাদের সেবা দিয়ে গেছেন বলেই সুনাম কুড়িয়েছেন।

তবে রাজধানীর ওয়ারীর লকডাউনের সময় ওয়ারীবাসী যখন অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল, তখন রেগেমেগে অন্য এলাকার এক ভদ্রলোক সুচিত্রা সেনের উদাহরণ টেনে বলেছেন, তিনি ৩০ বছর ঘর থেকে বের হননি। আপনারা ৩০ দিন পারবেন না কেন? এই ভদ্রলোকের বক্তব্য অনুপ্রাণিত হয়ে স্বেচ্ছায় কেউ গৃহবন্দি হয়েছেন, এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে ঘরে থাকতে থাকতে মাথা বিগড়ে যাওয়া এক স্বামী তার স্ত্রীকে প্রশ্ন করেছেন, তুমি যে আমার স্ত্রী তার কোনো প্রমাণ আছে? স্ত্রী খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, কেন কাবিননামা আছে, একগাদা ছবি আছে। উত্তর শুনে স্বামী বললেন, এতে কিছু প্রমাণিত হয় না। রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের কাগজ আছে, গাদা গাদা ছবিও আছে। তবুও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, তিনি এর কিছু জানেন না। এদের কাউকে চিনেন না। সুতরাং এসব কাবিননামা আর ছবি দেখিয়ে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে এসো না। আমি তোমাকে চিনি না। স্ত্রী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

তাই অনেকের মন্তব্য, করোনাভাইরাসের চাইতে আমাদের দেশে, সমাজে যে ভয়াবহ ভাইরাস বিরাজ করছে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগও দরকার। করোনা হয়তো একদিন নিয়ন্ত্রণ আসবে কিন্তু এসব ভাইরাসকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? এই ধরুন শান্তিনগর এর একটা উজ্জ্বল উদাহরণ। আপনি হয়তো বলতে পারেন, শান্তিনগর আবার কি করল? কী অশান্তি দেখলেন শান্তিনগরে? গত কয়েকদিন ধরে ভারীবর্ষণে প্রায় পানি জমছে শান্তিনগরে। শত কোটি টাকা খরচ হয়েছে এর জলাবদ্ধতা দূরীকরণে। কোনো লাভ হয়নি। এরকম এক রাতভর বৃষ্টির পর এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে লাইভ করছে টেলিভিশনের এক রিপোর্টার। স্টুডিও থেকে সংবাদ পাঠিকা জিজ্ঞেস করছেন, আচ্ছা বলুন তো শান্তিনগরে সর্বশেষ অবস্থা কি? রিপোর্টার দেখল, সামনে লুঙ্গি তুলে এক পথচারী রাস্তার এপার থেকে ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করছে। লুঙ্গি আরেকটু তুললেই…। সংবাদ পাঠিকার প্রশ্নের উত্তরে রিপোর্টার বলছে, শান্তিনগরে পানি এখন ইজ্জতের তিন ইঞ্চি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। স্টুডিওতে থাকা সংবাদ-পাঠিকা এই ইজ্জত বিষয়ে প্রশ্ন নিয়ে আর এগোননি। কার ইজ্জত যে কোথায়, তা এখন পরিমাপ করা আসলেই কঠিন। এক সাবেক মন্ত্রীর মেয়ে ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট নিয়ে বিমানে ওঠার সময় ধরা পড়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা ভালো স্কোর করেছি। এসব ঘটনার পর ইজ্জত কি আর থাকে? এই স্কোরের হিসাবে কত মানুষের জীবন যে গেল, তার হিসাব কে রাখে? এই নকল করোনা সার্টিফিকেটের যুগে নকল করোনা রোগীও আছে। একজন বললেন, চক চক করলে যেমন সোনা হয় না, তেমন খক খক করে কাশলে করোনা রোগী হওয়া যায় না। অনেকে অফিস ফাঁকি দেয়ার জন্য ভুয়া করোনা রোগী সাজার চেষ্টা করেন। তেমন এক কর্মী ২ দিন ছুটি কাটানোর জন্য ৩০ দিনের ছুটির আবেদন করেছেন। বস জিজ্ঞেস করলেন, ছুটি কাটাবেন ২ দিন, ৩০ দিনের আবেদন কেন? ছুটির আবেদনকারী বললেন, যাওয়ার পর ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন। তারপর ২ দিন ছুটি। এরপর ফিরে এসে আবার ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন, মোট ৩০ দিন। অনেকে ছুটি কাটানোর জন্য ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট দিয়ে ধরা পড়ে চাকরিও খুইয়েছেন। আর এ কথাও বুঝতে হবে, চোখের দৃষ্টি দুর্বল, মেজাজ খারাপ, সহজে রেগে যায়, ঘুমাতে কষ্ট হয়- ইদানীং এই লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে। অনেকের মতে, এই লক্ষণগুলো করোনা রোগীর লক্ষণ নয়। একজন জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কিসের লক্ষণ এটা? উত্তর এলো এরা করোনা পজিটিভ নয়, এটা হলো পোভার্টি পজিটিভ। এটা পকেটের টাকাপয়সা না থাকার লক্ষণ। টাকাপয়সার অভাবে ইদানিং অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত। পকেটে টাকাপয়সা না থাকলেও মানুষের চিন্তায় অভিনবত্বের অভাব নেই। এক ভদ্রলোক গেছেন করোনা পরীক্ষা করতে। যখন শুনলেন পরীক্ষার জন্য টাকা দিতে হবে, তিনি ডাক্তারের মুখের ওপর একটা হাঁচি দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলেন। তিনদিন পর আবার ওই পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে চুপিচুপি খোঁজ নিলেন ওই ডাক্তারের করোনা হয়েছে কিনা। যখন শুনলেন হয়নি তখন ভদ্রলোক নিশ্চিন্ত। তার মানে ডাক্তার যেহেতু আক্রান্ত নয়, তাহলে তারও করোনা হয়নি। করোনা পরীক্ষার এই অভিনবত্ব নিশ্চয়ই আপনি অস্বীকার করবেন না।

করোনার থাবায় বিশ্ব
আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই, সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া একটি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে। লেখাটা শুরু করেছিলাম মানুষের বেঁচে থাকার অফুরান শক্তি নিয়ে। শেষও করতে চাই মানুষের বেঁচে থাকার প্রবল আগ্রহ নিয়ে। তাই তো বেঁচে থাকার প্রবল আগ্রহী কবি লিখেছেন,

‘ইচ্ছে হলে খোকা হব
ইচ্ছে হলে বুড়ো,
সময়টা কোন লাটের বেটা
বলবে আমায় ফুরো?
চুলে আমার পাক ধরেছে
মন পাকলো কই?
এখনোতো চাঁদ দেখলে
অবাক হয়ে রই।
ইচ্ছেমতো যাচ্ছি বেঁচে
ইচ্ছে হলে উঠব নেচে,
ইচ্ছে হলে একশো হবো
ইচ্ছে হলে জিরো
সময়টা কোন লাটের ব্যাটা
বলবে আমায় ফুরো।